শীতের রাতে নিমতলীর মেঠো পথটা যেন ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়ি দিয়ে ঝিমুচ্ছিল। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় পৌনে দুটো। নিজের পুরোনো বাইকটা নিয়ে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল অর্ক। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। রাস্তার ঠিক ডানপাশেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রায়বাড়ির পরিত্যক্ত রাজবাড়িটি। গ্রামের বয়স্কদের মুখে শোনা যায়, অমাবস্যার রাতে ওই বাড়ির আনাচে-কানাচে নাকি অশরীরীদের আনাগোনা বাড়ে। অর্ক এসব অলৌকিক গল্পে কখনোই কান দেয়নি, কিন্তু ঠিক বটগাছের নিচে রাজবাড়ির প্রধান ফটকের সামনে আসতেই অদ্ভুতভাবে তার বাইকের ইঞ্জিনটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। অর্ক বারবার কিক মেরেও বাইকটা স্টার্ট দিতে পারল না। ঠিক তখনই চারপাশের আবহাওয়া যেন আচমকাই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হয়ে গেল। বাতাসের তাজা গন্ধ উধাও হয়ে গিয়ে এক বিটকেল, পচা আঁশটে গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে রাজবাড়ির চারতলার ভাঙা ছাদ থেকে ভেসে এল এক করুণ অথচ মিষ্টি সুরের গান। সেই সুরে এমন একটা মায়াবী টান ছিল যা অর্কের গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অর্ক চমকে উঠে চারপাশটা দেখতেই নজরে এল—ফটকের ভেতর থেকে ঘন কুয়াশার বুক চিরে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে এক নারীমূর্তি। তার পরনে একদম পুরোনো আমলের ঝালর দেওয়া লাল বেনারসি শাড়ি, আর পায়ে ঘুঙুর। কদম ফেলার সাথে সাথে ছম-ছম শব্দে নিঝুম রাতটা যেন আরও থমথমে হয়ে উঠল। লাল শাড়ির আঁচলটা বাতাসে দুলছে, অথচ গাছে একটা পাতাও নড়ছিল না। অর্ক কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার মনে হচ্ছিল শরীরের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেছে। মূর্তিটি ধীরে ধীরে অর্কের মাত্র কয়েক হাত দূরে এসে থামল। অর্ক শুকনো গলায় কোনোমতে তোতলে উঠে বলল, "ক... কে আপনি?" নারীমূর্তিটি কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে তার মুখটা ওপরের দিকে তুলল। আর ঠিক তখনই অর্কের বুকটা ধক করে উঠল—মেয়েটির চেহারায় কোনো চোখ, নাক বা মুখ কিচ্ছু নেই! এক ধবধবে মসৃণ, ফাঁকা চামড়ার উপরিভাগ অর্কের দিকে চেয়ে রয়েছে, আর তার গলার ভেতর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক অদ্ভুত, বুক কাঁপানো অতিলৌকিক হাসি! ভয়ে চিৎকার করে উঠে বাইকটা সেখানেই ফেলে সোজা গ্রামের দিকে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল অর্ক। পেছনে পেছনে তখন ভেসে আসছে সেই ঘুঙুরের দ্রুত আওয়াজ আর অশরীরী হাসির প্রতিধ্বনি। পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা রাজবাড়ির সামনে অর্কের বাইকটি খুঁজে পায়। তবে বাইকের চারপাশের ধুলোয় কোনো মানুষের পায়ের ছাপ ছিল না, পড়ে ছিল শুধু বাতাসে ভেসে চলার এক রহস্যময় চিহ্ন। অর্ক আজও অমাবস্যার রাতে জানালা খোলার সাহস পায় না, কারণ সে জানে—কিছু অতীত কখনোই মেটে না, তারা কেবল রাতের অন্ধকারে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
Sponsored
Related
View allComments
No comments yet.